পবিত্র কোর'আনে আল্লাহ তা'য়লা বলেন,
"আর যদি তোমরা ভয় কর যে, এতীম মেয়েদের হক যথাথভাবে পুরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে, একটিই অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা"। (সুরা আন-নিসা ৩)
"তবে তাদের স্ত্রী এবং মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না হলে তারা তিরস্কৃত হবে না"। (সুরা আল-মুমিনুন ৬)
"হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন এবং বিবাহের জন্য বৈধ করেছি আপনার চাচাতো ভগ্নি, ফুফাতো ভগ্নি, মামাতো ভগ্নি, খালাতো ভগ্নিকে যারা আপনার সাথে হিজরত করেছে। কোন মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করে, নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য-অন্য মুমিনদের জন্য নয়। আপনার অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশে। মুমিনগণের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার জানা আছে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু"। (সুরা আল-আহযাব ৫০)
উক্ত আয়াতগুলো একজন মুমিন নারী অস্বীকার করতে পারবেন না। কেননা আল্লাহ তা'য়লা সীমা নির্ধারন করে রেখেছেন। যেখানে দুনিয়াতে নির্ধারিত সীমার মাঝেই একজন পুরুষ অধিক সংখ্যক নারীদের ভোগ করার অধিকার পাচ্ছেন, তবে জান্নাতের মতো চিরস্থায়ী জায়গায় আল্লাহ্ কেনো তাদের আরো অধিক নারীর সঙ্গকে বৈধ করবেন না??
ইমাম শাফী'ঈ (রহ) নারীদের ব্যবহার্য অলংকারের উপর যাকাত দিতে হবে না বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। এর অন্যতম একটি কারন ছিলো নারীরা দুনিয়াতে অলংকারের প্রতি দুর্বল এবং তা আল্লাহ তাদের জন্য বৈধ করেছেন। আর এজন্যই আল্লাহ জান্নাতে তাদের অলংকার এবং উত্তম সাজ-সজ্জা দান করবেন।
আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: জান্নাতবাসীদের স্ত্রীদের (সৌন্দর্য এমন হবে যে) সত্তর জোড়া কাপড়ের ভেতর থেকেও তাদের পায়ের নলার শুভ্রতা পরিদৃষ্ট হবে, এমন কি হাড্ডির মগজ পর্যন্ত দেখা যাবে। [ সুনান তিরমিজী - ২৫৩৫ ]
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ "তারা যেন ইয়াকুত ও মারজানের মত"। (সুরা আর রাহমানঃ ৫৮)
এর দ্বারাই বোঝা যায়, নারীদের সাজসজ্জা হলো পুরুষের একজন নারীকে কাছে পাওয়ার মতোই চাওয়া। আল্লাহ্ তাঁর বান্দার অন্তরের চাওয়ার খবর রাখেন, এবং এ অনুযায়ী নিয়ামাত দান করে থাকেন দুনিয়া ও আখিরাতে; সুবহানআল্লাহ।
এরপরও একজন নারী যিনি জান্নাতি হবেন, তিনি পৃথিবীতে সাধারনত ৬ টি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখেন।
১) অবিবাহিত অবস্থায় একজন নারী মারা যেতে পারেন।
২) কিংবা তিনি পুর্বের স্বামী কর্তৃক তালাক প্রাপ্ত হওয়ার পর অন্য কারো সাথে বিয়ের পুর্বেই মারা যেতে পারেন।
৩) অথবা তিনি বিবাহিতা অবস্থায় মারা গেলেন, কিন্তু তার স্বামী জাহান্নামী।
৪) অথবা তিনি বিবাহিতা অবস্থায় মারা গেলেন এবং তার স্বামীও জান্নাতী।
৫) হতে পারে স্বামী প্রথমে মারা গেছে আর সে নারী মৃত্যুর পুর্বে আর বিয়ে করেন নি।
৬) নতুবা কোন নারীর স্বামী মারা গেছেন এবং এরপর তিনি অপর পুরুষকে বিয়ে করলেন।
এধরনের প্রত্যেকটি অবস্থার মাঝ দিয়ে যাওয়া নারীদের জন্যই জান্নাতে পুরষ্কার রয়েছে। নিম্নে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে-
১) অবিবাহিত অবস্থায় একজন নারী মারা গেলে কিংবা তিনি পুর্বের স্বামী কর্তৃক তালাক প্রাপ্ত হওয়ার পর অন্য কারো সাথে বিয়ের পুর্বেই মারা গেলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে দুনিয়ার কোনো পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেবেন। কারণ আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘কিয়ামতের দিন যে দলটি সর্বপ্রথম জন্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল; আর তৎপরবর্তী দলের চেহারা হবে আসমানে মুক্তার ন্যায় ঝলমলে নক্ষত্র সদৃশ উজ্জ্বল। তাদের প্রত্যেকের থাকবে দু’জন করে স্ত্রী, যাদের গোশতের ওপর দিয়েই তাদের পায়ের গোছার ভেতরস্থ মজ্জা দেখা যাবে। আর জান্নাতে কোনো অবিবাহিত থাকবে না।’ [মুসলিম : ৭৩২৫]
উক্ত হাদিস এটাই নির্দেশ করে, জান্নাতী পুরুষদের চেহারা হবে পুর্নিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল, নক্ষত্রের মতো, মনিমুক্তোর মতো উজ্জ্বল। আসলে, নেয়ামত ও সুখসম্ভার শুধু পুরুষদের জন্য নয়। বরং তা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য বরাদ্দ। আর তাই জান্নাতি নারীদের সৌন্দর্য্য বর্ননার পাশাপাশি তাদের স্বামীদের সৌন্দর্যের বর্ননাও হাদিসে এসেছে। তাদের মাঝে বিবাহ হবে এই তথ্য ও আছে। এটাই উক্ত প্রথম দুটি অবস্থার মাঝ দিয়ে যাওয়া দুনিয়ায় নারীদের জন্য পুরুষ্কার।
৩ নং অবস্থার মাঝ দিয়ে যাওয়া নারীরা যাদের স্বামীরা জান্নাতে প্রবেশ করেননি তারাও তাদের অবস্থার মতো সে সকল পুরুষ - যারা দুনিয়ায় মারা গেছেন জান্নাতি হিসেবে, কিন্তু তাদের স্ত্রীগন জাহান্নামী; তাদের বিয়ে করবেন। কিন্তু যদি তিনি বিবাহিতা অবস্থায় মারা গেলেন এবং তার স্বামীও জান্নাতী, যা ৪নং পয়েন্টে বলা হয়েছে, তবে তিনি সেই স্বামীরই হবেন যার কাছ থেকে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। কেননা পবিত্র কোর'আনে আল্লাহ বলেছেন,
"জান্নাতে প্রবেশ কর তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীগণ সানন্দে" (সুরা আয-যুখরুফ ৭০)
৫ নং পয়েন্টে উল্লেখিত, স্বামী প্রথমে মারা গেছেন আর সে নারী মৃত্যুর পুর্বে আর বিয়ে করেন নি। এক্ষেত্রে তিনি জান্নাতে তার স্বামীর নিকট থাকবেন। কেননা,হুযায়ফা রাদিআল্লাহু আনহু তাঁর স্ত্রীর উদ্দেশে বলেন,
‘যদি তোমাকে এ বিষয় খুশী করে যে তুমি জান্নাতে আমার স্ত্রী হিসেবে থাকবে তবে আমার পর আর বিয়ে করো না। কেননা জান্নাতে নারী তার সর্বশেষ দুনিয়ার স্বামীর সঙ্গে থাকবেন। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীদের জন্য অন্য কারো সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে জড়ানো হারাম করা হয়েছে। কেননা তাঁরা জান্নাতে তাঁরই স্ত্রী হিসেবে থাকবেন।’ [বাইহাকী, আস-সুনান আল-কুবরা : ১৩৮০৩]
৬ নং পয়েন্টে উল্লেখিত যদি কোন নারীর স্বামী মারা যায় এবং এরপর তিনি অপর পুরুষকে বিয়ে করলেন তাহলে তিনি যত বিয়েই করুন না কেন জান্নাতে সর্বশেষ স্বামীর সঙ্গী হবেন। কারণ, আবূ দারদা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘মহিলা তার সর্বশেষ স্বামীর জন্যই থাকবে।’ [জামে‘ ছাগীর : ৬৬৯১]
তবে ৬ নং পয়েন্টের ব্যাপারে ইখতিলাফ আছে। অনেক আলেমগন ভিন্ন একটি হাদিসকে দলিল হিসেবে এনেছেন, যেখানে বলা হয়েছে -নারীরা চাইলে যে কোন একজন স্বামীকেই বেছে নিতে পারবেন।
উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্নিত, তিনি বলেনঃ আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা)! যদি কোন মহিলা দুনিয়াতে একাধিক স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় থাকে, আর মহিলার মৃত্যুর পর জান্নাতে প্রবেশ করে এবং তার স্বামীরা প্রত্যেকেই জান্নাতে প্রবেশ করে তবে এদের মধ্যে কে মহিলার স্বামী হবে?’ তিনি রাসুল (সা) বললেন, হে উম্মে সালামাঃ ঐ মহিলা নিজের পছন্দ মতো তার স্বামীদের থেকে যে কাউকে বেছে নিতে পারবে। আর নিঃসন্দেহে সে উত্তম চরিত্রের স্বামীকেই বেছে নিবে। মহিলা আল্লাহর নিকট আরয করবে যে, 'হে আল্লাহ! এ ব্যক্তি দুনিয়াতে আমার সাথে সবচেয়ে ভালো ভাবে চলেছে, অতএব তার সাথেই আমার বিয়ে দিন'। হে উম্মে সালামা! উত্তম চরিত্র দুনিয়া এবং আখিরাতের সমস্ত কল্যানের মাঝে উত্তম।
(তাবরানী/ আন নিহায়া লি ইবন কাসির, ফিল ফিতন আল মালাহেম খন্ড ২-পৃ-৩৮৭)
এছাড়াও জান্নাতী নারীরাই হবে সকল হুরদের সর্দারনী এবং সকল হুরেরা তাদের সেবিকা হিসেবে নিয়োজিত থাকবে যা হাদিসে এসেছে।
তিরমিযি শরীফে এসেছে, নিম্নমানের জান্নাতীদের জন্য ৮০ হাজার খাদেম থাকবে যারা মনিমুক্তোর ন্যায় বিচরন করবে এবং তাদের আদেশ পালনে নিয়োজিত থাকবে। এটা নারী এবং পুরুষ সকলের জন্যই থাকবে।
আর জান্নাত হবে হিংসা -বিদ্বেষহীন যেখানে স্বামীর অধিক পরিমান হূরদেখে নারীদের কোন প্রকার হিংসা হবে না, বরং তারা হবে কামিনী, পুর্নযৌবনা, সমবয়স্কা এবং স্বামী অনুরাগী...
আশা করছি, এই ছোট লেখাটি অনেকের জমে থাকা প্রশ্নের উত্তর গ্রহনে সহজ করবে। ওমা তৌফিকী ইল্লা বিল্লা।
